, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে বান্দরবানে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন, আনসার-ভিডিপি জেলা কমান্ড্যান্ট শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বান্দরবান সেনা জোনের আর্থিক অনুদান বিতরণ বান্দরবানে সাকসেস একাডেমিক অ্যান্ড অ্যাডমিশন কেয়ারের অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত ক্যান্সার আক্রান্ত আসমার পাশে মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী, চিকিৎসায় নগদ অর্থ সহায়তা সূর্যমুখী শিশু কিশোর ফাউন্ডেশন এর ২৯ তম প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা উপকরণ ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত। বান্দরবানে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ৭ মাসের শিশু আহাদ, বাঁচাতে প্রয়োজন মানবিক সহযোগিতা। বান্দরবানের বালাঘাটার শিশু আব্দুল্লাহ আল আহাদ চট্টগ্রামের ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে; চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার  লামায় নদীর ঘাটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালালো পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ বান্দরবানে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিএনপির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত, অংশ নিলেন মাধবী মার্মা এমপি

বান্দরবানে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে দুই প্রকল্প ৬০ কোটি টাকার প্রকল্পে টয়লেট, গভীর নলকূপ, জিএফএস ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং—সুবিধা পাচ্ছেন দুর্গম এলাকার মানুষ

  • প্রকাশের সময় : ১১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩০ পড়া হয়েছে

বান্দরবান প্রতিনিধি:

পার্বত্য জেলা বান্দরবানে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এসব প্রকল্পের আওতায় পৌরসভা ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ, পুরোনো টয়লেট সংস্কার, গভীর নলকূপ স্থাপন, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকা মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই ও সমন্বিত পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’-এর আওতায় বান্দরবান পৌর এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন স্যানিটেশন অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত।
প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান পৌর এলাকায় ৬৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট নির্মাণ, ৮৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট উন্নয়ন, ৫টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং ৮টি পাবলিক টয়লেট সংস্কার করা হচ্ছে। একই প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান পৌরসভা ও লামা পৌরসভায় প্রায় ২০০টি টয়লেটের নির্মাণ ও সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি টয়লেটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে পৌর এলাকার নিম্নআয়ের পরিবারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারের ব্যবহার কমার পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নানা সমস্যায় পড়তে হতো। নতুন টয়লেট নির্মাণ ও পুরোনো টয়লেট উন্নয়নের ফলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে আসছে।

সিদ্দিকনগরের স্থানীয় বাসিন্দা সাগর বলেন, নতুন স্যানিটেশন সুবিধা চালু হওয়ায় এলাকার মানুষের অনেক উপকার হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা হওয়ায় পরিবেশও আগের তুলনায় পরিচ্ছন্ন থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।

হাফেজঘোনার বাসিন্দা কামাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির সমস্যা ছিল। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ কমছে।

৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পে জেলার সাত উপজেলায় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘বান্দরবানের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ নামে আরও একটি প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় বান্দরবানের সাত উপজেলা—বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি—এ নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে পুরোনো ১২টি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত, নতুন ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন, ৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এসব প্রকল্পের গুরুত্ব অনেক বেশি। পাহাড়ি জনপদে অনেক সময় নিরাপদ পানির উৎসের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কোথাও আবার ঝিরি-ঝরনা বা অস্বাস্থ্যকর পানির উৎস ব্যবহার করতে হয়। নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, গভীর নলকূপ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালুর ফলে এসব এলাকার মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ বাড়ছে।

তালুকদার পাড়ার তালুকদার পাড়া বৌদ্ধ বিহারের সভাপতি মংক্য প্রু মার্মা বলেন, আগে নিরাপদ পানির জন্য এলাকার মানুষকে অনেক দূরে যেতে হতো। এখন পানি সরবরাহের ব্যবস্থা হওয়ায় মানুষের সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে এ ধরনের ব্যবস্থা স্থানীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রোয়াজা পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা হ্নাক্রা মার্মা (৬৫) বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়ে। এলাকায় পানির ব্যবস্থা হওয়ায় বয়স্ক মানুষসহ পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।

ডংখিংঅং পাড়ার ইয়য়নু মারমা বলেন, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করছে না, বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও কমাতে সহায়তা করবে।
যৌথ খামার এলাকার বাসিন্দা তিতিউ মার্মা বলেন, পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। নতুন পানির উৎস ও স্যানিটেশন সুবিধা চালু হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। তবে এসব স্থাপনা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বান্দরবানের মতো পাহাড়ি জেলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনমান সরাসরি জড়িত।
একদিকে পৌর এলাকায় হাউসহোল্ড ও পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ চলছে, অন্যদিকে জেলার দুর্গম পাড়াগুলোতে জিএফএস, রিংওয়েল, গভীর নলকূপ ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে শুধু পৌর এলাকায় নয়, জেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাতেও নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে জেলার টিএন্ডটি পাড়া, হাফেজঘোনা, নিউগুলসান, হাসপাতাল এলাকা, সিদ্দিকনগর, সুয়ালক ও হলুদিয়া এলাকায় স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, গভীর নলকূপ স্থাপন এবং রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদ ও সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
পাহাড়ি অঞ্চলে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির সহজলভ্যতা কম এবং অনেক এলাকায় ঝিরি-ঝরনা ও প্রাকৃতিক পানির উৎসের ওপর মানুষকে নির্ভর করতে হয়, সেখানে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পানির সংকট মোকাবিলায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

দুটি প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত ও চলমান এসব কার্যক্রম পুরোপুরি কার্যকর হলে বান্দরবানের শহর ও প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার মানুষের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের পানির দুর্ভোগ লাঘবে চাহিদার ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় টিউবওয়েল, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ও জিএফএস স্থাপন করা হয়েছে। আরও দুর্গম এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর এসব স্থাপনার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে। তাহলেই সরকারি বিনিয়োগের সুফল দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় বান্দরবান আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

জনপ্রিয়

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে বান্দরবানে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন, আনসার-ভিডিপি জেলা কমান্ড্যান্ট

error: Content is protected !!

বান্দরবানে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে দুই প্রকল্প ৬০ কোটি টাকার প্রকল্পে টয়লেট, গভীর নলকূপ, জিএফএস ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং—সুবিধা পাচ্ছেন দুর্গম এলাকার মানুষ

প্রকাশের সময় : ১১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বান্দরবান প্রতিনিধি:

পার্বত্য জেলা বান্দরবানে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এসব প্রকল্পের আওতায় পৌরসভা ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ, পুরোনো টয়লেট সংস্কার, গভীর নলকূপ স্থাপন, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকা মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই ও সমন্বিত পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’-এর আওতায় বান্দরবান পৌর এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন স্যানিটেশন অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত।
প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান পৌর এলাকায় ৬৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট নির্মাণ, ৮৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট উন্নয়ন, ৫টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং ৮টি পাবলিক টয়লেট সংস্কার করা হচ্ছে। একই প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান পৌরসভা ও লামা পৌরসভায় প্রায় ২০০টি টয়লেটের নির্মাণ ও সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি টয়লেটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে পৌর এলাকার নিম্নআয়ের পরিবারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারের ব্যবহার কমার পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নানা সমস্যায় পড়তে হতো। নতুন টয়লেট নির্মাণ ও পুরোনো টয়লেট উন্নয়নের ফলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে আসছে।

সিদ্দিকনগরের স্থানীয় বাসিন্দা সাগর বলেন, নতুন স্যানিটেশন সুবিধা চালু হওয়ায় এলাকার মানুষের অনেক উপকার হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা হওয়ায় পরিবেশও আগের তুলনায় পরিচ্ছন্ন থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।

হাফেজঘোনার বাসিন্দা কামাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির সমস্যা ছিল। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ কমছে।

৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পে জেলার সাত উপজেলায় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘বান্দরবানের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ নামে আরও একটি প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় বান্দরবানের সাত উপজেলা—বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি—এ নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে পুরোনো ১২টি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত, নতুন ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন, ৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এসব প্রকল্পের গুরুত্ব অনেক বেশি। পাহাড়ি জনপদে অনেক সময় নিরাপদ পানির উৎসের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কোথাও আবার ঝিরি-ঝরনা বা অস্বাস্থ্যকর পানির উৎস ব্যবহার করতে হয়। নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, গভীর নলকূপ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালুর ফলে এসব এলাকার মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ বাড়ছে।

তালুকদার পাড়ার তালুকদার পাড়া বৌদ্ধ বিহারের সভাপতি মংক্য প্রু মার্মা বলেন, আগে নিরাপদ পানির জন্য এলাকার মানুষকে অনেক দূরে যেতে হতো। এখন পানি সরবরাহের ব্যবস্থা হওয়ায় মানুষের সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে এ ধরনের ব্যবস্থা স্থানীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রোয়াজা পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা হ্নাক্রা মার্মা (৬৫) বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়ে। এলাকায় পানির ব্যবস্থা হওয়ায় বয়স্ক মানুষসহ পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।

ডংখিংঅং পাড়ার ইয়য়নু মারমা বলেন, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করছে না, বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও কমাতে সহায়তা করবে।
যৌথ খামার এলাকার বাসিন্দা তিতিউ মার্মা বলেন, পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। নতুন পানির উৎস ও স্যানিটেশন সুবিধা চালু হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। তবে এসব স্থাপনা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বান্দরবানের মতো পাহাড়ি জেলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনমান সরাসরি জড়িত।
একদিকে পৌর এলাকায় হাউসহোল্ড ও পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ চলছে, অন্যদিকে জেলার দুর্গম পাড়াগুলোতে জিএফএস, রিংওয়েল, গভীর নলকূপ ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে শুধু পৌর এলাকায় নয়, জেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাতেও নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে জেলার টিএন্ডটি পাড়া, হাফেজঘোনা, নিউগুলসান, হাসপাতাল এলাকা, সিদ্দিকনগর, সুয়ালক ও হলুদিয়া এলাকায় স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, গভীর নলকূপ স্থাপন এবং রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদ ও সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
পাহাড়ি অঞ্চলে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির সহজলভ্যতা কম এবং অনেক এলাকায় ঝিরি-ঝরনা ও প্রাকৃতিক পানির উৎসের ওপর মানুষকে নির্ভর করতে হয়, সেখানে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পানির সংকট মোকাবিলায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

দুটি প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত ও চলমান এসব কার্যক্রম পুরোপুরি কার্যকর হলে বান্দরবানের শহর ও প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার মানুষের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের পানির দুর্ভোগ লাঘবে চাহিদার ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় টিউবওয়েল, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ও জিএফএস স্থাপন করা হয়েছে। আরও দুর্গম এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর এসব স্থাপনার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে। তাহলেই সরকারি বিনিয়োগের সুফল দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় বান্দরবান আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।