রনি সিকদার, বান্দরবান প্রতিনিধি।
বান্দরবান জেলার দুর্গম রুমা উপজেলার রেমাক্রী প্রাংসা ইউনিয়নে অবস্থিত মুনলাই পাড়া বর্তমানে দেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত পাহাড়ি গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। রুমাবাজার–কেওক্রাডং সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা বম সম্প্রদায়ের এই গ্রামটি ইতোমধ্যে তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর গ্রামের স্বীকৃতি পেয়েছে। ছবির মতো সাজানো-গোছানো পরিবেশের কারণে দিন দিন পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে মুনলাই পাড়া।
বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার সড়কপথ পাড়ি দিলেই পৌঁছানো যায় এই গ্রামে। ১৯৮৩ সালে প্রায় ৩০টি বম পরিবার নিয়ে যাত্রা শুরু করা মুনলাই পাড়া শুরু থেকেই পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার জন্য আলাদা গুরুত্ব দিয়ে আসছে। চারদিকে পাহাড় আর সাঙ্গু নদীর সৌন্দর্যে ঘেরা এই গ্রামটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য।
গ্রামবাসীদের মতে, তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অংশ হিসেবেই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হয়। নিয়মিতভাবে বাড়িঘর, রাস্তা-ঘাট এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার কারণে পুরো গ্রাম সবসময়ই ঝকঝকে থাকে। গ্রামের সকল বাসিন্দা সম্মিলিতভাবে এই উদ্যোগ বজায় রাখায় মুনলাই পাড়া পরিচ্ছন্ন গ্রামের মর্যাদা অর্জন করেছে।
পর্যটনের দিক থেকেও মুনলাই পাড়া বিশেষ সম্ভাবনাময়। এখানে ইকো-ফ্রেন্ডলি হোমস্টে, পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী খাবার, ট্রেকিং, কায়াকিংসহ নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার উপভোগের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া দেশের দীর্ঘতম জিপ-লাইন স্থাপনের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সময় সময় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।
মুনলাই পাড়ায় এসে পর্যটকরা বম সম্প্রদায়ের জীবনধারা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। পাহাড়ি শাক-সবজি, জুম চাষের বিনী চাল, বিভিন্ন স্থানীয় মসলা এবং বম নারীদের হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও হস্তশিল্প সামগ্রীও পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
এ গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি ও পর্যটন। তবে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি এবং পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারের কারণে রুমা উপজেলায় পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে মুনলাই পাড়াসহ পুরো এলাকার পর্যটননির্ভর মানুষের জীবনে বড় ধরনের আর্থিক সংকট দেখা দেয়।
সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ায় আবারও রুমা উপজেলার পর্যটন খাতে প্রাণ ফিরে আসছে। নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মুনলাই পাড়ার বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, পরিচ্ছন্নতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আন্তরিক আতিথেয়তার কারণে মুনলাই পাড়া ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠবে।













