হাতি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান, ক্ষতিগ্রস্ত ১২ পরিবার পেল ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা
বান্দরবান প্রতিনিধি:
“বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বান্দরবানে বিশ্ব হাতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে হাতি সংরক্ষণ বিষয়ক সচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে হাতি ও মানুষের মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করা, হাতির আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের সহযোগিতায় বান্দরবান টংকাবতী রেঞ্জের আয়োজনে এ সচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভা শেষে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১২টি পরিবারের মাঝে মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়। সহায়তা পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তারা বলেন, হাতির কারণে বিভিন্ন সময়ে ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হলেও এমন সহায়তা তাদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, হাতি শুধু বন্যপ্রাণী নয়, এটি দেশের বন ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বন উজাড়, হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্য ও বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়া এবং মানুষের বসতি ও কৃষিজমি হাতির চলাচলের এলাকায় বিস্তৃত হওয়ার কারণে দিন দিন মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়ছে।
তারা বলেন, হাতির আবাসস্থল রক্ষা করা গেলে এবং হাতির চলাচলের পথগুলো নিরাপদ রাখা গেলে মানুষ ও হাতির সংঘাত অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য স্থানীয় জনগণকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। হাতির উপস্থিতি বা চলাচলের খবর পেলে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতা অবলম্বন এবং বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
বান্দরবান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফা সুলতানা খান হীরামনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম।বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ৫ নম্বর টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাং য়ং ম্রো (প্রদীপ)।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী বন সংরক্ষক রিতা আক্তার, টংকাবতী রেঞ্জ কর্মকর্তা রাফি উদ দৌলা সরদারসহ বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাতি সংরক্ষণের পাশাপাশি হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোও প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হলে মানুষ-হাতি সংঘাত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, হাতি আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাতি রক্ষায় শুধু বন বিভাগের একার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, হাতি সংরক্ষণে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে হাতির বিচরণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে হাতির আচরণ, চলাচলের সময় এবং সংঘাত এড়ানোর উপায় সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা কার্যক্রম আরও সহজ ও দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
আলোচনা সভা শেষে বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি টংকাবতী এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় হাতি সংরক্ষণ, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং মানুষ-হাতির সংঘাত বন্ধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক স্লোগান দেওয়া হয়।
আয়োজকরা জানান, বিশ্ব হাতি দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো হাতি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, হাতির আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো। বান্দরবানের পাহাড়ি বনাঞ্চলে হাতি ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ এবং বিশ্ব হাতি দিবসের এই আয়োজন স্থানীয় জনগণের মধ্যে হাতি সংরক্ষণ বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

















